Thursday, July 17, 2014

৪২ বছর পর সূর্যের আলোয়, ২২ বছর পর শৃঙ্খলমুক্তি

কুলসুম বেগম ৪২ বছর পর সূর্যের আলোয় চোখ মেললেন; হাওয়ার পরশ পেলেনএখন তাঁর বয়স ৫৮ বছরষোড়শী কিশোরী বিয়ের পর সেই যে ঢুকেছিলেন স্বামীর ঘরে, এরপর আর ঘরের বাইরে পা রাখতে পারেননিসে ঘরকে ঘর না বলে খঁোয়াড় বা বন্দিশালা বলাই ভালো৪২ বছর বন্দি থেকে সূর্যের আলো-বাতাস গায়ে মাখলেন তিনি
বিয়ের পর স্বামী 'পীর' সেখ নুর মোহাম্মদ ধর্মীয় সংস্কার রক্ষার কথা বলে কুলসুম বেগমকে আলো-বাতাসহীন বদ্ধ ঘরে থাকতে বাধ্য করেন; বাইরে বেরোতে দেননিশুধু কুলসুম বেগমকে নয়, নুর মোহাম্মদ তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী পারভীন আক্তারকেও একইভাবে ২২ বছর ধরে ওই ঘরে আটকে রাখেনতাঁদের তিন মেয়েও জন্মের পর ঘর থেকে বের হয়নি
'লালসালু' উপন্যাসে বিবৃত ধর্মব্যবসায়ী 'মজিদ'-এর কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করে ছোট স্ত্রী 'জমিলা'কে নির্মম অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিলধর্মের নামে স্বামীর অন্ধ সংস্কারের প্রতিবাদ করায় প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কুলসুম বেগমওএমনকি ছোট স্ত্রী পারভীনকে কয়েক বছর শিকলবন্দি করে রাখেন নুর মোহাম্মদ

বছরের পর বছর কথিত পীর নুর মোহাম্মদের এই অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তাঁরই এক প্রতিবাদী ছেলে শেষ পর্যন্ত থানায় গিয়ে অভিযোগ করেনসেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাগেরহাট মডেল থানার পুলিশ গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বাগেরহাট শহরের সরুই এলাকায় নুর মোহাম্মদের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাঁর দুই স্ত্রী ও চার ছেলেমেয়েকে উদ্ধার করেতবে অভিযানের খবর পেয়ে নুর মোহাম্মদ পালিয়ে যান
পুলিশের হাতে উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে রয়েছেন নুর মোহাম্মদের প্রথম স্ত্রী কুলসুম বেগম (৫৮), দ্বিতীয় স্ত্রী পারভীন আক্তার (৩৫), প্রথম স্ত্রীর মেয়ে ফাতেমা সুলতানা (৩৫), ছোট স্ত্রীর দুই মেয়ে সালমা আক্তার (১১), নুর জাহান (৬) ও ছেলে মাহাবুব বিল্লাহ (৩)উদ্ধারের সময় নারীদের পরনে শুধু শাড়ি ছিলপরে এলাকার মানুষ ব্লাউজ, পেটিকোট ও বোরকা এনে দেয়অতঃপর পুলিশ তাঁদের থানায় নিয়ে যায়
পারিবারিক সুরক্ষা আইন-২০০০-এর ৪ ধারায় পুলিশ তাঁদের উদ্ধার দেখিয়ে বাগেরহাট চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠালে বিচারক তাঁদের বাগেরহাট নিরাপদ আবাসন কেন্দ্রে পাঠান
সেখ নুর মোহাম্মদ বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া ইউনিয়নের মেহগনীতলা এলাকার মোহাম্মদীয়া (স.) খানকা শরিফের পীর হিসেবে পরিচিতশহরের সরুই এলাকায় চারদিক বদ্ধ, এমন একটি বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস তাঁরওই বাড়িতে খানকা শরিফের শাখা অফিস লেখা একটি সাইনবোর্ডও রয়েছে
নুর মোহাম্মদের প্রথম স্ত্রী কুলসুম বেগম জানান, বিয়ের পর পর্দার নামে ৪২ বছর ধরে তিনি তালাবদ্ধ ঘরে বন্দি ছিলেনদশ বছর আগে তাঁর বাবা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার রাজৈর গ্রামের মুন্সী আব্দুল হামিদ মারা যানকিন্তু স্বামী তাঁকে বাবার লাশ দেখতে যেতেও দেননিপ্রায়ই তাঁকে এবং সতীন ও ছেলেমেয়েদের মারধর করতেন নুর মোহাম্মদতালাবদ্ধ ঘরটিতে ছিল না কোনো জানালাসামনে-পেছনে দুটি দরজা ছিল এবং সেগুলোতে সব সময় তালা মেরে রাখা হতোমেজ মেয়েকে দুই বছর আগে বাগেরহাট পুলিশ সুপারের মাধ্যমে ছেলে বাকী বিল্লাহ বিয়ে দিয়েছেবোনের বিয়ে দেওয়ায় ছেলের ওপর রুষ্ট হন তাঁর স্বামীএ অপরাধে ছেলে বাকী বিল্লাহকে বাড়ি থেকে বের করে দেন নুর মোহাম্মদ
কুলসুম বেগম আরো জানান, তাঁর এক মেয়ের বয়স ৩৫ বছরকিন্তু এখনো তাঁর বিয়ে হয়নিতাঁকে বিয়ে দেওয়ার জন্য স্বামী কোনো পাত্রও দেখেননিওই ঘরেই ছেলেমেয়ে ও দুই স্ত্রী নিয়ে নুর মোহাম্মদ বসবাস করতেনতিনি স্বামীর হাত থেকে মুক্তি চান
নুর মোহাম্মদের দ্বিতীয় স্ত্রী পারভীন আক্তার জানান, ২২ বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়েছেবিয়ের পর থেকেই বন্দিদুই বছর আগে একবার তিনি কৌশলে পালিয়ে গিয়েছিলেনপরে স্বামী তাঁর মুরিদদের সহায়তায় তাঁকে ধরে এনে পায়ে শিকল দিয়ে আটকে রাখেনতাঁকেও কখনো ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হয়নিদুই বেলা কিছু খাওয়ার দেওয়া হতোতাঁর স্বামী চারটি বিয়ে করেছেনতবে আছেন মাত্র তাঁরা দুই স্ত্রী
কুলসুম বেগম ও পারভীন আক্তারের মাধ্যমে সেখ নুর মোহাম্মদ ৯ ছেলে ও চার মেয়ের বাবাঅন্য দুই স্ত্রীর মাধ্যমে কোনো সন্তান নেই তাঁর
উদ্ধার করে বাগেরহাট মডেল থানায় আনা হলে দুই মা ও তাঁদের ছেলেমেয়েদের দেখতে সেখানে ছুটে যান অভিযোগকারী বাকি বিল্লাহ এবং তাঁর ভাই মাসুম বিল্লাহ ও মাহফুজ বিল্লাহতাঁরা অভিযোগ করে বলেন, 'ইসলাম নারীদের পর্দায় থাকতে বলেছে ঠিকই, তবে আমাদের বাবা ইসলামের নামে মা ও বোনদের প্রতি অন্যায় করেছেনজানালাবিহীন ঘরে তালাবদ্ধ অবস্থায় তাঁদের বন্দি করে রেখেছিলেনঅনেক সময় আমাদের দুই মাকে শারীরিকভাবে নির্যাতনও করা হয়েছে'
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. নিজামুল হক মোল্যা জানান, নুর মোহাম্মদের ছেলে সেখ বাকী বিল্লাহ গত ২৬ জুন তাঁর কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেনপুলিশ প্রাথমিকভাবে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেআজ (বৃহস্পতিবার) পুলিশ ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে নুর মোহাম্মদের দুই স্ত্রী ও চার ছেলেমেয়েকে উদ্ধার করে আদালতে পাঠায়আদালতের বিচারক তাঁদের বাগেরহাট নিরাপদ আবাসন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন

No comments:

Post a Comment